নারী ও পুরুষ আল্লাহর সৃষ্টির দুই অংশ। সৌন্দর্য্যের দুই সংজ্ঞা। বিপরীতমুখী দুই চরিত্রের একত্রে মিলেমিশে বসবাস করার এক অনুপম নজির। শুধু বাহ্যিক সৃষ্টির দিক দিয়ে নয়, এ দুইয়ের মাঝে রয়েছে আচরণ ও চলাফেরার দিক থেকেও নানা ব্যবধান।
তাই তারতম্য তৈরি হয়েছে বিভিন্ন মাসয়ালার ক্ষেত্রেও। যেমন- নারীর পর্দা নিজেকে আবরণে, অপরদিকে পুরুষের পর্দা দৃষ্টির হেফাজতে। উচ্চস্বরে আজান দেবে পুরুষ, নারী হেফাজত করবে নিজ কণ্ঠ। এমনই দশদিকের মতো নারীদের নামাজের পদ্ধতিতেও রয়েছে ভিন্নতা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তো একই, তবে তাদের পর্দা ও আড়ালে থাকার বিবেচনায় সামান্য কিছু পার্থক্য রয়েছে। এখানে নামাজের পার্থক্যগুলো উল্লেখ করা হলো-
» নারীরা যতটুকু সম্ভব গোপনীয়তার মাধ্যমে সালাত আদায় করবে। এই মর্মে আল্লাহ মহান পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, তোমরা গৃহাভন্তরে অবস্থান করবে এবং মুর্খতা যুগের অনুরূপ নিজেদেরকে প্রদর্শন করবে না। (সুরা আল আহযাব, আয়াতঃ ৩৩)
» হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, হুজুর (সাঃ) এরশাদ করেন, নারীদের নিজকক্ষে নামাজ পড়া বাড়িতে নামাজ পড়ার তুলনায় উত্তম, আর নির্জন ও অন্দরকক্ষে নামাজ পড়া ঘরের সমুখকক্ষে নামাজ পড়া থেকে উত্তম। (আবু দাউদ ১/৩৮৩, মুসতাদরাকে হাকেম ১/৩২৮)
» হজরত আয়েশা (রাঃ) রাসুল (সাঃ) থেকে বর্ণনা করেন, ওড়না বা চাদর ছাড়া নারীদের নামাজ কবুল হবে না। (আবু দাউদ ১/৪২১ তিরমিজী ২/২১৫-মুসতাদরাকে হাকিম ১/৫১)
» উল্লেখিত আয়াত ও হাদিস দ্বারা এ কথা সুস্পষ্টভাবে প্রতিয়মান হয় যে, নারীদের সব সময় পর্দার আড়ালেই থাকা প্রয়োজন। আর নামাজ ইসলামের অন্যতম একটি বিধান সুতরাং নারীর নামাজ অধিক পর্দায় হবে, এটাই বিবেকের দাবী।
» তাকবিরে তাহরিমার সময় নারীরা হাত তুলবে কাঁধ পর্যন্ত। বিপরীতে পুরুষরা হাত তুলবে কান বরাবর। ইমাম যুহরী (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নারীরা কাঁধ পর্যন্ত হাত ওঠাবে। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা : ১/২৭০)
» নারীরা পুরুষের মত নাভীর নিচে হাত বাঁধবে না বরং নারীরা তাদের হাত বুকের ওপর বাঁধবে। ইমাম তহাবী (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নারীরা তাদের উভয় হাতকে বুকের ওপর রেখে দেবে, আর এটাই তাদের জন্য যথোপযুক্ত সতর। (আসসিআয়া : ২/১৫৬, ফাতাওয়ায়ে শামী: ১/৫০৪, আল মাবসুত সারাখসী : ১/২৫)
» নামাজি নারীর সামনে দিয়ে অতিক্রমকারী ব্যক্তিকে বাধা দেওয়ার ক্ষেত্রে করণীয় কি? রাসুল (সাঃ) এ প্রসঙ্গে বলেন, পুরুষদের জন্য হলো তাসবিহ বলা আর নারীদের জন্য হাতে আওয়াজ করা। (সহীহ বুখারী ১/৪০৩)
» রুকু সম্পর্কে মক্কা বাসীদের ইমাম আতা ইবনে আবী রাবাহ (রহঃ) বর্ণনা করেন, নারী যখন রুকুতে যাবে অত্যন্ত সংকুচিতভাবে যাবে এবং হাতদ্বয় পেটের সাথে মিলিয়ে রাখবে। (সহীহ মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক ৩/১৩৭)
» সেজদার সময় নারীরা এক অঙ্গের সঙ্গে অপর অঙ্গ মিলিয়ে কোমর নিচু করে জড়সড় হয়ে থাকবে। বিপরীতে পুরুষরা কোমর উঁচু করে রাখবে, এক অঙ্গ থেকে অপর অঙ্গ ফাঁক করে রাখবে। তাবেয়ি ইয়াযিদ ইবনে আবি হাবিব (রহঃ) বলেন, একবার রাসূল (সাঃ) নামাজরত দুই মহিলার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তাদের বললেন, যখন সিজদা করবে তখন শরীর জমিনের সঙ্গে মিলিয়ে দেবে। কেননা মহিলারা এক্ষেত্রে পুরুষদের মতো নয়। (কিতাবুল মারাসিল, ইমাম আবু দাউদ: ৮০)
» বসার সময় নারীরা পুরুষদের মতো পায়ের ওপর বসবে না। বরং দু’পা ডান দিকে বের করে দিয়ে সরাসরি মাটির ওপর বসবে। বিপরীতে পুরুষরা বাম পা নিচে রেখে তার ওপর বসবে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, নারীরা যখন নামাজের মধ্যে বসবে তখন যেন (ডান) উরু অপর উরুর উপর রাখে। আর যখন সেজদা করবে তখন যেন পেট উরুর সঙ্গে মিলিয়ে রাখে; যা তার সতরের জন্য অধিক উপযোগী। আল্লাহতায়ালা তাকে দেখে (ফেরেশতাদের সম্বোধন করে) বলেন, ওহে আমার ফেরেশতারা! তোমরা সাক্ষী থাকো, আমি তাকে ক্ষমা করে দিলাম। (সুনানে কুবরা, বায়হাকি: ২/২২৩)
» হজরত খালেদ ইবনে লাজলাজ (রহঃ) বলেন, নারীদেরকে আদেশ করা হতো তারা যেন নামাজে দুই পা ডান দিক দিয়ে বের করে নিতম্বের ওপর বসে, পুরুষদের মতো না বসে, আবরণীয় কোনো কিছু প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় নারীদেরকে এমনটি করতে হয়। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা: ১/৩০৩)
» একবার হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) কে জিজ্ঞাসা করা হলো, মহিলারা কীভাবে নামাজ আদায় করবে? তিনি বললেন, খুব জড়সড় হয়ে অঙ্গের সঙ্গে অঙ্গ মিলিয়ে নামাজ আদায় করবে। (আল মুসান্নাফ, ইবনে আবি শায়বা: ১/৩০২)
» এভাবে নির্ভরযোগ্য রেওয়ায়েতে বর্ণিত হাদিসে নারী-পুরুষের নামাজের পার্থক্য নির্ণয়ে মৌলিক নীতিমালাসমূহ বলে দেওয়া হয়েছে। এসব নীতিমালার আলোকে নারীদের নামাজে আরও কিছু পার্থক্য রয়েছে। যেমন- নারীরা নামাজে উভয় পা মিলিয়ে দাঁড়াবে, ফাঁকা রাখবে না। তাকবিরে তাহরিমার সময় দু’হাত ওড়নার ভেতরে রাখবে, ওড়নার বাইরে হাত বের করবে না। সামান্য ঝুঁকে রুকু করবে, পিঠ টানটান করবে না। রুকু ও সেজদায় হাত-পায়ের আঙুলগুলো মিলিয়ে রাখবে।
উপরের আলোচনায় এটা স্পষ্ট যে, নারী অন্যান্য ক্ষেত্রের মতোই নামাজের ক্ষেত্রেও পুরুষদের থেকে ভিন্ন, স্বতন্ত্র কিছু আদেশে আদিষ্ট। নারীদের নামাজের পার্থক্যের বিষয়টি নবীজি (সাঃ) এবং সাহাবীদের যুগ থেকেই চলে আসছে এবং এর পক্ষে অনেক শক্তিশালী দলিল রয়েছে। কাজেই, প্রত্যেক নারীরই সে আদেশ পালনে সচেষ্ট থাকা উচিত।